সমআয়ন প্রভাব
সমআয়ন প্রভাব (Common Ion Effect) কাকে বলে?
কোনো দুর্বল তড়িৎ বিশ্লেষ্যের (weak electrolyte) দ্রবণে যদি এমন একটি তীব্র তড়িৎ বিশ্লেষ্য (strong electrolyte) যোগ করা হয়, যার মধ্যে একটি আয়ন উভয় যৌগের ক্ষেত্রেই সাধারণ বা কমন (common), তখন ওই দুর্বল তড়িৎ বিশ্লেষ্যটির বিয়োজন মাত্রা (degree of dissociation) অর্থাৎ দ্রাব্যতা কমে যায়। ফলে সেখান থেকে কিছুটা অধঃক্ষেপ পড়ে। এই ঘটনাটিকেই সমআয়ন প্রভাব বলা হয়।

ব্যাপারটা একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে ভাবা যাক। মনে করো, একটা ছোট পার্কে কয়েকজন শিশু খেলছে। পার্কটি এমনিতেই ছোট, তাই বেশি ভিড় নেই। এখন যদি হঠাৎ করে বাইরে থেকে একদল শিশু এসে পার্কে ঢুকে পড়ে, তাহলে আগের শিশুরা আর ছোটাছুটি করার তেমন জায়গা পাবে না। তাদের খেলার পরিমাণ কমে যাবে। তাই কয়েকজন শিশু মন খারাপ করে এক কোনায় গিয়ে বসে থাকবে।
এখানে, দ্রবণে থাকা দুর্বল যৌগটির আয়নগুলো হলো প্রথম শিশুরা, আর বাইরে থেকে যোগ করা তীব্র যৌগের কমন আয়নগুলো হলো নতুন আসা শিশুদের দল।

মূল ভিত্তি: লা শাতেলিয়ারের নীতি
সমআয়ন প্রভাব আসলে লা শাতেলিয়ারের নীতির (Le Chatelier's Principle) একটি বাস্তব উদাহরণ। নীতিটি আমাদের বলে যে, কোনো বিক্রিয়া সাম্যাবস্থায় থাকাকালীন যদি তার তাপমাত্রা, চাপ বা ঘনমাত্রার কোনো পরিবর্তন করা হয়, তবে সাম্যাবস্থা এমন দিকে সরে যাবে যাতে ওই পরিবর্তনের ফলাফল প্রশমিত হয় বা বাতিল বা ব্যালেন্সড হয়।
সমআয়ন প্রভাবের ক্ষেত্রে, আমরা দ্রবণে একটি নির্দিষ্ট আয়নের ঘনমাত্রা বাড়িয়ে দিই, ফলে বিক্রিয়াটি পেছনের দিকে সরে গিয়ে ওই আয়নের ঘনমাত্রা কমানোর চেষ্টা করে।
এক কথায়

উদাহরণ
উদাহরণ ১: দুর্বল অ্যাসিডের ক্ষেত্রে
অ্যাসিটিক অ্যাসিড (CH₃COOH) একটি দুর্বল অ্যাসিড। এটি পানিতে খুব সামান্য পরিমাণে বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺) এবং অ্যাসিটেট আয়ন (CH₃COO⁻) তৈরি করে এবং একটি সাম্যাবস্থা তৈরি করে।
এখন, এই দ্রবণে যদি আমরা সোডিয়াম অ্যাসিটেট (CH₃COONa) লবণ যোগ করি, তাহলে কী হবে?
১. সোডিয়াম অ্যাসিটেট একটি তীব্র তড়িৎ বিশ্লেষ্য হওয়ায় এটি পানিতে প্রায় পুরোপুরি বিয়োজিত হয়ে প্রচুর পরিমাণে অ্যাসিটেট আয়ন (CH₃COO⁻) এবং সোডিয়াম আয়ন (Na⁺) তৈরি করবে।
২. দ্রবণে আগে থেকেই অ্যাসিটিক অ্যাসিডের বিয়োজনের কারণে কিছু অ্যাসিটেট আয়ন ছিল। এখন নতুন করে আরও অ্যাসিটেট আয়ন যোগ হওয়ায় দ্রবণে অ্যাসিটেট আয়নের (CH₃COO⁻) মোট ঘনমাত্রা অনেক বেড়ে যাবে। এই অ্যাসিটেট আয়নটিই হলো আমাদের "সমআয়ন"।
৩. লা শাতেলিয়ারের নীতি অনুযায়ী, সিস্টেমটি এই বাড়তি অ্যাসিটেট আয়নের ঘনমাত্রা কমাতে চাইবে
৪. এটি করার জন্য, অতিরিক্ত অ্যাসিটেট আয়নগুলো (CH₃COO⁻) দ্রবণের কিছু হাইড্রোজেন আয়নের (H⁺) সাথে যুক্ত হয়ে আবার অবিয়োজিত অ্যাসিটিক অ্যাসিড (CH₃COOH) তৈরি করবে। অর্থাৎ, বিক্রিয়াটি বাম দিকে সরে আসবে।
ফলাফল: অ্যাসিটিক অ্যাসিডের বিয়োজিত হওয়ার হার কমে যাবে।
উদাহরণ ২: স্বল্প দ্রাব্য লবণের অধঃক্ষেপণে
সিলভার ক্লোরাইড (AgCl) একটি স্বল্প দ্রাব্য লবণ, অর্থাৎ এটি পানিতে খুব অল্প পরিমাণে দ্রবীভূত হয় এবং সিলভার আয়ন (Ag⁺) ও ক্লোরাইড আয়ন (Cl⁻) হিসেবে সাম্যাবস্থায় থাকে।
এখন এই দ্রবণে যদি আমরা সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl)-এর মতো কোনো তীব্র তড়িৎ বিশ্লেষ্য যোগ করি, তবে কী ঘটবে?
১. সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) পানিতে সম্পূর্ণ বিয়োজিত হয়ে প্রচুর পরিমাণে ক্লোরাইড আয়ন (Cl⁻) তৈরি করবে।
২. দ্রবণে ক্লোরাইড আয়নের (Cl⁻) ঘনমাত্রা অনেক বেড়ে যাবে, যা এখানে "সমআয়ন"।
৩. এই বাড়তি ক্লোরাইড আয়নের প্রভাব কমানোর জন্য সাম্যাবস্থাটি বাম দিকে সরে যাবে।
৪. অর্থাৎ, অতিরিক্ত ক্লোরাইড আয়নগুলো (Cl⁻) দ্রবণে থাকা সিলভার আয়নের (Ag⁺) সাথে যুক্ত হয়ে কঠিন সিলভার ক্লোরাইড (AgCl) হিসেবে পাত্রের নিচে জমা হবে বা অধঃক্ষিপ্ত (precipitate) হবে।
ফলাফল: সমআয়ন প্রভাবের কারণে সিলভার ক্লোরাইডের দ্রাব্যতা (solubility) আরও কমে যাবে।
সমআয়ন প্রভাবের প্রয়োগ
- ল্যাবরেটরিতে গুণগত বিশ্লেষণে: বিভিন্ন ধাতব আয়ন শনাক্ত করার জন্য এই নীতির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। যেমন—
গ্যাস ও ব্যবহার করে ক্যাটায়ন আলাদা করার সময় এই প্রভাব কাজে লাগানো হয়। - বাফার দ্রবণ প্রস্তুতিতে: যে দ্রবণ সামান্য পরিমাণ অ্যাসিড বা ক্ষার যোগ করার পরেও নিজের pH মান প্রায় স্থির রাখতে পারে, তাকে বাফার দ্রবণ বলে। এই বাফার দ্রবণের কার্যকারিতার মূল ভিত্তিই হলো সমআয়ন প্রভাব।
Demo Questions and Explanations
১। কোনো তাপমাত্রায় AgCl এর দ্রাব্যতা গুণফল (Ksp) হলো । ঐ একই তাপমাত্রায় 0.1 M দ্রবণে এর দ্রাব্যতা কত হবে?
এখানে যা ঘটছে:
- দুর্বল তড়িৎ বিশ্লেষ্য: সিলভার ক্লোরাইড (AgCl), যা পানিতে খুব সামান্য দ্রবীভূত হয়।
- তীব্র তড়িৎ বিশ্লেষ্য: সিলভার নাইট্রেট (AgNO₃), যা পানিতে সম্পূর্ণ বিয়োজিত হয়।
- সমআয়ন (Common Ion): সিলভার আয়ন (Ag⁺), যা AgCl এবং AgNO₃ দুটো থেকেই আসছে।
বিশ্লেষণ:
AgNO₃ যোগ করার কারণে দ্রবণে আগে থেকেই প্রচুর পরিমাণে Ag⁺ আয়ন (0.1 M) উপস্থিত থাকবে। লা শাতেলিয়ারের নীতি অনুযায়ী, সিস্টেমটি এই বাড়তি Ag⁺ আয়নের প্রভাব কমাতে চাইবে। তাই AgCl এর বিয়োজনের সাম্যাবস্থাটি বাম দিকে সরে যাবে। অর্থাৎ, AgCl এর দ্রবীভূত হওয়ার প্রবণতা বা দ্রাব্যতা (solubility) অনেক কমে যাবে।
সমাধান:
১. ধরি, 0.1 M AgNO₃ দ্রবণে AgCl এর নতুন দ্রাব্যতা = S molL⁻¹।
২. তাহলে, AgCl থেকে আসা [Ag⁺] = S এবং [Cl⁻] = S।
৩. কিন্তু দ্রবণে AgNO₃ থেকে আসা [Ag⁺] = 0.1 M।
৪. সুতরাং, দ্রবণে মোট [Ag⁺] = (AgCl থেকে আসা S) + (AgNO₃ থেকে আসা 0.1) = (S + 0.1) M।
৫. এখন, AgCl এর Ksp এর সমীকরণটি লিখি:
গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ও শর্টকাট:
যেহেতু সমআয়ন প্রভাবের কারণে AgCl এর দ্রাব্যতা 'S' অনেক কমে যাবে, তাই 0.1 এর তুলনায় 'S' এর মান অত্যন্ত নগণ্য
তাই আমরা লিখতে পারি,
এখন সমীকরণটি দাঁড়ায়:
✅ শর্টকাট ট্রিক:
সমআয়ন উপস্থিত থাকলে,

এখানে,
২। 25°C তাপমাত্রায় BaSO₄ এর । এই তাপমাত্রায় 0.1 M BaCl₂ এর জলীয় দ্রবণে BaSO₄ এর দ্রাব্যতা কত?
এখানে যা ঘটছে:
- দুর্বল তড়িৎ বিশ্লেষ্য: বেরিয়াম সালফেট (BaSO₄)।
- তীব্র তড়িৎ বিশ্লেষ্য: বেরিয়াম ক্লোরাইড (BaCl₂)।
- সমআয়ন: বেরিয়াম আয়ন (Ba²⁺)।
বিশ্লেষণ:
আগের মতোই, BaCl₂ যোগ করায় দ্রবণে Ba²⁺ আয়নের ঘনমাত্রা (0.1 M) অনেক বেড়ে গেছে। ফলে BaSO₄ এর বিয়োজন সাম্যাবস্থা বাম দিকে সরে যাবে এবং এর দ্রাব্যতা কমে যাবে।
গাণিতিক সমাধান:
১. ধরি, BaCl₂ দ্রবণে BaSO₄ এর নতুন দ্রাব্যতা = S₁ molL⁻¹।
২. BaSO₄ থেকে আসা [Ba²⁺] = S₁ এবং [SO₄²⁻] = S₁।
৩. BaCl₂ থেকে আসা [Ba²⁺] = 0.1 M।
৪. সুতরাং, দ্রবণে মোট [Ba²⁺] = (S₁ + 0.1) M।
৫. BaSO₄ এর Ksp সমীকরণ:
শর্টকাট প্রয়োগ:
যেহেতু S₁ এর মান 0.1 এর তুলনায় খুবই নগণ্য, তাই (S₁ + 0.1) ≈ 0.1।
✅ শর্টকাট ট্রিক:

৩। 500mL BaCl₂ সম্পৃক্ত দ্রবণের । এই দ্রবণে 0.1M যোগ করলে এর দ্রাব্যতা কত হবে? এক্ষেত্রে কতটুকু অধঃক্ষেপ পাওয়া যাবে?
এখানে যা ঘটছে:
- স্বল্প দ্রাব্য লবণ (প্রশ্ন অনুযায়ী): বেরিয়াম ক্লোরাইড (BaCl₂)।
- তীব্র তড়িৎ বিশ্লেষ্য: অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড (AlCl₃)।
- সমআয়ন: ক্লোরাইড আয়ন (Cl⁻)।
বিশ্লেষণ:
AlCl₃ যোগ করার কারণে দ্রবণে Cl⁻ আয়নের ঘনমাত্রা অনেক বেড়ে যাবে, যা BaCl₂ এর দ্রাব্যতাকে কমিয়ে দেবে এবং কিছু BaCl₂ পাত্রের নিচে কঠিন হিসেবে জমা হবে (অধঃক্ষিপ্ত হবে)।
ধাপ ১: নতুন দ্রাব্যতা নির্ণয়
১. ধরি, AlCl₃ যোগ করার পর BaCl₂ এর নতুন দ্রাব্যতা = S₁ molL⁻¹।
২. তাহলে, BaCl₂ থেকে আসা [Ba²⁺] = S₁ এবং [Cl⁻] = 2S₁।
৩. AlCl₃ থেকে আসা [Cl⁻] = 3 × 0.1 = 0.3 M। (লক্ষ্য করো, AlCl₃ তে ৩টি Cl⁻ আছে)
৪. সুতরাং, দ্রবণে মোট [Cl⁻] = (BaCl₂ থেকে আসা 2S₁) + (AlCl₃ থেকে আসা 0.3) = (2S₁ + 0.3) M।
৫. BaCl₂ এর Ksp সমীকরণ:
শর্টকাট প্রয়োগ:
যেহেতু S₁ এর মান খুবই কম হবে, তাই 2S₁ এর মান 0.3 এর তুলনায় নগণ্য। (2S₁ + 0.3) ≈ 0.3।
এই হলো AlCl₃ যোগ করার পর BaCl₂ এর নতুন দ্রাব্যতা।
ধাপ ২: অধঃক্ষেপের পরিমাণ নির্ণয়
অধঃক্ষেপ বের করতে হলে আমাদের জানতে হবে AlCl₃ যোগ করার আগে দ্রাব্যতা কত ছিল এবং পরে কত হলো।
১. আগের দ্রাব্যতা (S) নির্ণয়:
AlCl₃ যোগ করার আগে, সম্পৃক্ত দ্রবণে:
২. অধঃক্ষিপ্ত BaCl₂ এর পরিমাণ:
- আগের ঘনমাত্রা (S) = 2.154 × 10⁻³ M
- নতুন ঘনমাত্রা (S₁) = 4.44 × 10⁻⁷ M
- ঘনমাত্রার পার্থক্য = S - S₁ = (2.154 × 10⁻³ - 4.44 × 10⁻⁷) mol/L ≈ 2.1535 × 10⁻³ mol/L
- এই পরিমাণ BaCl₂ প্রতি লিটার দ্রবণ থেকে অধঃক্ষিপ্ত হয়েছে।
- আমাদের দ্রবণটি 500mL বা 0.5L।
- সুতরাং, অধঃক্ষিপ্ত মোল সংখ্যা = 2.1535 × 10⁻³ mol/L × 0.5 L = 1.076 × 10⁻³ mol।
- এখন এটিকে গ্রামে প্রকাশ করি (BaCl₂ এর আণবিক ভর = 208.3 g/mol)।
- অধঃক্ষেপের ভর = মোল × আণবিক ভর = 1.076 × 10⁻³ × 208.3 ≈ 0.224 গ্রাম।